মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

ভোলাহাট উপজেলার ইতিহাস

থানা হিসেবে অভ্যূদয়:

বারবার রাজনৈতিক ও ভৌগলিক পট পরিবর্তনের ফলে এ জনপদটি পুরাকালে পুন্ড্রবর্ধন ভূক্তি, পাঠান আমলে জান্নাতাবাদ বা লখনৌতি সরকারের অধিন, পরবর্তীকালে পূর্ব দিনাজপুর, পূর্ণিয়া, মালদহ, রাজশাহী ও সর্বশেষ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার অর্ন্তভূক্ত হয়।

সম্রাট শের শাহ্‌ তার সম্রাজ্যকে বিভিন্ন সরকার এবং সরকারগুলিকে ভিন্ন ভিন্ন পরগণায় বিভক্ত করেন। সম্রাট আকবরের আমলে সৃষ্ট ২০টি সরকারের মধ্যে জান্নাতাবাদ ওরফে লখনৌতি সরকার অন্যতম। জান্নাতাবাদ বা লখনৌতি সরকারের অধীনে ছিল মোট ৬৬ মহল বা পরগণা। এ সময়ে সমগ্র ভোলাহাট ছিল “ ভাতিয়া ” পরগণা বা মহলের অর্ন্তভূক্ত। এর রাজস্ব মূল্য ছিল ৮,২৬,৪৩২ দাম। মোঘল আমলে প্রচলিত মূদ্রায় এবং ৪০ দামে সে সময় ১ টাকা হত। পরগণার সাথে উল্লিখিত দামগুলিকে ৪০ দ্বারা ভাগ করলেই টাকার মূল্যমান বের হয়ে পড়বে। বৃটিশ শাসনামলে জমিদারী প্রথায় সমগ্র ভোলাহাট “ ভাতিয়া ” পরগণার পরিবর্তে নামকরণ হয় “ ভাতিয়া গোপালপুর ”। এর অধিন কতগুলি মৌজা গঠনের মাধ্যমে সৃষ্টি করা হয় ছোট ছোট মহল।

১৭৭২ খ্রিঃ লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস প্রথম সমন্বিত জেলা সৃষ্টি করেন। ঐ সময় সমগ্র দেশকে ১৯টি জেলায় বিভক্ত করা হয়। এ সময় মালদহ ও ভোলাহাট অঞ্চল দিনাজপুর জেলার মধ্যে অর্ন্তভূক্ত হয়। ১৭৯৩ সালে এ অঞ্চল পূর্ণিয়া জেলার অর্ন্তভূক্ত এবং ১৮১৩ সালের মার্চ মাসে মতান্তে ১৮১৫ সালে ভোলাহাট মালদহ জেলার অর্ন্তভূক্ত হয়।

কিংবদন্তী অনুযায়ী ১৭৬৩ হতে ১৮০০ সালের মধ্যে দেশে যে ফকির বা সন্যাসী বিদ্রোহ দেখা দেয়, তা দমনের জন্য ভোলাহাট এলাকায় সর্বপ্রথম গিলাবাড়ী বি,ডি,আর ক্যাম্পের ওপরই স্থাপন করা হয় পুলিশ ফাঁড়ি বা থানা বলে জানা যায়। তবে মূলতঃ ১৮১৩ মতান্তে ১৮১১ সালেই নাকি ভোলাহাট পূর্ণাঙ্গ থানায় রূপলাভ করে বলে জানা যায়। ভোলাহাট থানায় আজও একটি বৃটিশ আমলের টেবিল বিদ্যমান রয়েছে। এতে “মালদহ পুলিশ” কথাটি লিখা আছে।

১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর ভোলাহাট অঞ্চল নবাবগঞ্জ মহুকুমা এবং রাজশাহী জেলার অর্ন্তভূক্ত হয়। ১৯৮৩ সালের ২ জুলাই ভোলাহাট থানাকে মান উন্নীত থানা পরর্তীতে উপজেলায় রূপান্তরিত করা হয়। ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ ভোলাহাট অঞ্চল নবগঠিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার অর্ন্তভূক্ত হয়। পাক আমলে ভোলাহাট থানার ৩টি ইউনিয়ন ছিল। ১৯৭১ সালের পর ৩ নং দলদলী ইউনিয়ন হতে জামবাড়ীয়াকে পৃথক করে একটি পূর্ণাঙ্গ ইউনিয়নে রূপ দেয়া হয়।

 

নামকরণ:

ভোলাহাট নামকরণ কি করে হলো এ নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন, অনেক বিতর্ক আর কিছু রহস্য লুকিয়ে আছে। ভোলাহাট শব্দ অক্ষর ও শব্দ যোজনে বিন্যাসিত রহস্য, তাকি ভোলা ভালা বা আত্মভোলা, নযনাভিরাম প্রাকৃতিক বৈভবেরই কি বহিপ্রকাশ। এ কারণেই কি ভোলাহাট নামকরণ হয়েছে?

সে যাই হোক, ভোলাহাট নামকরণে ঐতিহাসিক দলিলপত্র না থাকায় এ জনপদের নামকরণ নিয়ে যথেষ্ট বিতর্কের অবকাশ রয়েছে।

কিংবদন্তী আছে যে, ভোলা নামে জনৈক সন্যাসী প্রায় তিনশ বছর পূর্বে এ অঞ্চলের উত্তর-পশ্চিমাংশে আস্তানা গড়ে তোলেন। পরে সেখানে একটি হাট গড়ে উঠে এবং উক্ত সন্যাসীর নামানুসারে এ অঞ্চলের নামকরণ করা হয় ভোলাহাট।

অন্য একটি জনশ্রুতি মতে জানা যায়, ওলি আউলিয়ার এ দেশে এক সময় ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে অসংখ্য ওলি, আউলিয়া ও বুর্জগ ব্যক্তির এ দেশে আগমন ঘটে। সেই মধ্য যুগে হযরত শাহ ভোলা নামে জনৈক ধর্ম প্রচারক হিন্দু প্রধান এ এলকায় আগমন পূর্বক বহু বিধর্মীকে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় দেন। তারই নামানুসারে ভোলাহাট নামকরণ করা হয়।

আর একটি সূত্র মতে ভুলু শাহ নামক একজন তাপসের নাম থেকে গ্রামটির (ভোলাহাট) উৎপত্তি হয়। অফিসার ক্লাবের কাছে তাঁর কবর আছে। এ গ্রামটি প্রাচীন গৌড় নগরীর অত্যন্ত কাছে অবস্থিত।

ভোলাহাট গ্রামের আদি নাম ছিল ভোলানাথ। গৌড়ের হিন্দু রাজা কংশ বা গনেশের ছেলে জিতুমল ধর্মান্তরিত জালাল উদ-দীন মুহাম্মদ শাহ যদুর শাসন কালে (১৪১৫-১৪৩২ খ্রি:) তাঁর নামানুসারে ভোলাহাট যাদুনগর বা যাদুনগর নামকরণ করা হয়। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক এলাহী বখশের পান্ডুলিপির উদ্ধৃতি দিয়ে পাদটিকায় লেখা রয়েছে ভোলানাথের নিকট মালদহের একটি গ্রাম যাদুনগর।

এ বর্ণনা হতে সহজেই সিদ্ধান্তে উপনিত হওয়া যায় যে, সুলতানী আমলে ভোলাহাট নামক গ্রামের নাম ছিল ভোলানাথ। পরবর্তীকালে সে ভোলানাথ সমগ্র উপজেলার ভোলাহাট নামকরণের মর্যাদা প্রাপ্ত হয়েছে।

অনার্যদের দেবতা শিব। শিবের অপর নাম মহাদেব বা ভোলানাথ। মহানন্দা তীরবর্তী এ এলাকার লোকজন শিবের পূজা করতেন। অত্র এলাকাতে শিব পূজার জন্য ৩৬টি মতান্তরে ৫৬টি শিব মন্দির ছিল বলে জানা যায়। এখনও কালের সাক্ষী হয়ে ভগ্ন জীর্ণপ্রায় ৪টি শিব মন্দির দাঁড়িয়ে আছে। একটি জায়গায় এত অধিক সংখ্যক ভোলানাথের মন্দির থাকায় ভোলাহাট নামে অভিহিত হয়েছে বলে অনেকে অনুমান করেন। বহু পূর্ব হতেই সনাতন শৈব ধর্মাবলম্বীরা তাদের দেব দেবীর নামকরণ নিয়েই লোকালয়গুলির নামকরণ করতো। যেমন: ভোলানাথ বা ভোলাহাটের পাশ্ববর্তী গ্রামের নাম গোপিনাথপুর। আমাদের পাশ্র্ববর্তী একটি বিশাল উপজেলার নাম শিবগঞ্জ। সীমান্তের ওপারে রয়েছে মহাদেবপুর গ্রাম। স্বয়ং আমাদের ভোলাহাট উপজেলার জামবাড়ীয়া ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের নাম সনাতনীদের দেব দেবীর নামানুসারে অদ্যাবধি বিদ্যমান। দূর্গাপুর, কৃষ্ণপুর, কালিনগর, ব্রাহ্মননগর বা ব্রাহ্মণগ্রাম ইত্যাদি আজও সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে মুসলমান অধ্যসিত গ্রাম হিসেবে। যাই হোক, শিবের অপর নাম ভোলানাথ। আর এ নামের সাথে সংগতি রেখে এ এলাকার নামকরণ করা হয় ভোলাহাট।

পূর্বের সেই ভোলানাথ গ্রামের পাশেই বর্তমানের হাট বা সাঠিয়ার বাজার গড়ে ওঠার সংগত কারণেই সম্ভবত এর নামকরণ করা হয ভোলাহাট। বস্তত: উল্লিখিত তথ্য ভিত্তির উপর দাঁড় হয়ে অনেক পন্ডিত ব্যক্তিও ঐ নামকরণের যৌক্তিকতা সমর্থন করেছেন।